মাতা সূতা,,,

্সনাতন ধর্ম ও বিখ্যাত মহাকাব্য রামায়ণের অন্যতম প্রধান চরিত্র হলেন সীতা। তিনি ত্রেতাযুগের লক্ষ্মী দেবীর অবতার এবং মর্যাদা পুরুষোত্তম শ্রীরামচন্দ্রের সহধর্মিণী হিসেবে পূজিত হন। ভারতীয় সংস্কৃতি ও সাহিত্যে সীতাকে ত্যাগ, পতিভক্তি, ধৈর্য ও নারীত্বের এক পরম প্রতীক হিসেবে গণ্য করা হয়।


১. জন্ম ও নামকরণ

সীতার জন্ম সাধারণ মানুষের মতো কোনো গর্ভ থেকে হয়নি। মিথিলার রাজা জনক একবার যজ্ঞের ভূমি প্রস্তুত করার জন্য লাঙল দিয়ে মাঠ চষছিলেন। তখন লাঙলের ফলাটি (যাকে সংস্কৃতে 'সীত' বলা হয়) মাটির নিচে একটি পাত্রে আটকে যায়। সেই পাত্রটি উদ্ধার করার পর তার ভেতরে একটি ফুটফুটে কন্যাসন্তান পাওয়া যায়।


লাঙলের ফলার আঘাতে ভূমি থেকে জন্ম হওয়ায় তাঁর নাম রাখা হয় সীতা।


রাজা জনকের কন্যা (পালিত) হওয়ায় তাঁকে জানকী বলা হয়।


মিথিলার রাজকন্যা হওয়ায় তাঁর আরেক নাম মৈথিলী।


ভূমির গর্ভ থেকে আসায় তাঁকে ভূমিজা বা ধরণীসূতাও বলা হয়ে থাকে।


২. স্বয়ংবর ও বিবাহ

সীতা যখন বিবাহযোগ্যা হন, তখন রাজা জনক তাঁর বিয়ের জন্য একটি কঠিন শর্তসহ 'স্বয়ংবর' সভার আয়োজন করেন। শর্তটি ছিল— শিবের দেওয়া এক বিশাল ও ভারী ধনুক (হরধনু) যে বাঁকাতে পারবে, তাঁর গলাতেই সীতা মালা পরাবেন। বহু দেশের রাজা ও বীরেরা সেই ধনুক নড়াতেও ব্যর্থ হন। অবশেষে অযোধ্যার রাজকুমার শ্রীরামচন্দ্র সেই ধনুকে জ্যা আরোপ করতে যান এবং তাঁর প্রচণ্ড শক্তিতে ধনুকটি মাঝখান থেকে ভেঙে যায়। শর্তানুযায়ী রামের সাথে সীতার সাড়ম্বরে বিবাহ সম্পন্ন হয়।



৩. বনবাস ও পতিভক্তি

বিয়ের কিছুকাল পর এক পারিবারিক ষড়যন্ত্রের কারণে রামচন্দ্রকে ১৪ বছরের জন্য বনে যাওয়ার আদেশ দেওয়া হয়। রাজপ্রাসাদের সমস্ত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে সীতা ছায়ার মতো স্বামী রামচন্দ্রের অনুগামী হন। রামের ছোট ভাই লক্ষ্মণও তাঁদের সাথে বনে যান। তাঁরা দণ্ডকারণ্য বনে কুটির বানিয়ে বসবাস শুরু করেন।


৪. সীতাহরণ ও লঙ্কাকাণ্ড

বনবাসের শেষ বছরে লঙ্কার রাক্ষসরাজ রাবণ এক চতুর পরিকল্পনা করেন। মারীচ নামের এক রাক্ষসকে সোনার হরিণ সাজিয়ে সীতার সামনে পাঠানো হয়। সোনার হরিণটি দেখে সীতা সেটি পাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলে রাম সেটির খোঁজে যান। পরে লক্ষ্মণও রামের সন্ধানে বের হতে বাধ্য হন, তবে যাওয়ার আগে তিনি সীতার সুরক্ষার জন্য কুটিরের চারপাশে একটি জাদুকরী রেখা টেনে যান, যা লক্ষ্মণ রেখা নামে পরিচিত।


রাবণ এক সাধুর বেশ ধরে এসে ভিক্ষা চান এবং সীতাকে সেই রেখা পার হতে বাধ্য করেন। রেখা পার হতেই রাবণ তাঁর আসল রূপ ধারণ করে সীতাকে জোরপূর্বক অপহরণ করে লঙ্কায় নিয়ে যান। সেখানে রাবণ তাঁকে রাজপ্রাসাদে না রেখে অশোক বনে বন্দী করে রাখেন। সীতা অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে রাবণের সমস্ত প্রলোভন ও ভয়ভীতি প্রত্যাখ্যান করেন এবং রামের অপেক্ষায় দিন গুনতে থাকেন।


৫. অগ্নিপরীক্ষা

রামচন্দ্র সুগ্রীব, হনুমান ও বানরসেনাদের সহায়তায় লঙ্কা আক্রমণ করেন এবং রাবণকে বধ করে সীতাকে উদ্ধার করেন। তবে দীর্ঘকাল রাবণের বন্দিশালায় থাকায় সীতার পবিত্রতা নিয়ে সমাজে যেন কোনো প্রশ্ন না ওঠে, সেজন্য সীতাকে অনিচ্ছাসত্ত্বেও অগ্নিপরীক্ষা দিতে হয়েছিল। অগ্নিদেব নিজে সীতার পবিত্রতা প্রমাণ করে তাঁকে রামের হাতে তুলে দেন।


৬. সীতার নির্বাসন ও শেষ জীবন

অযোধ্যায় ফিরে আসার পর রাম রাজা হন এবং সীতা হন রানী। কিন্তু কিছুদিন পর অযোধ্যার এক সাধারণ ধোপার মন্তব্যের কারণে সীতার পবিত্রতা নিয়ে প্রজাদের মধ্যে কানাঘুষো শুরু হয়। রাজা হিসেবে প্রজাদের সন্তুষ্ট করতে এবং রাজধর্ম পালন করতে রামচন্দ্র ভারী হৃদয়ে গর্ভবতী সীতাকে বনবাসে পাঠিয়ে দেন।


বনে সীতা মহর্ষি বাল্মীকির আশ্রমে আশ্রয় নেন। সেখানেই তিনি দুই যমজ পুত্র লব ও কুশ-এর জন্ম দেন। বাল্মীকি মুনির আশ্রমে দুই রাজকুমার বড় হয়ে ওঠে এবং রামায়ণ গান শেখে।


৭. পাতালে প্রবেশ (মহাপ্রস্থান)

বহু বছর পর এক যজ্ঞের অনুষ্ঠানে রামচন্দ্র তাঁর দুই পুত্র লব ও কুশকে চিনতে পারেন এবং সীতার পবিত্রতার বিষয়ে পুনরায় নিশ্চিত হতে চান। সীতা নিজের আত্মসম্মান ও পবিত্রতা প্রমাণ করতে ক্লান্ত হয়ে তাঁর জন্মদাত্রী মা ধরিত্রীকে (পৃথিবী) আহ্বান জানান। তিনি বলেন, তিনি যদি মনে-প্রাণে কেবল রামকেই ভালোবেসে থাকেন, তবে ধরিত্রী মাতা যেন তাঁকে নিজের কোলে আশ্রয় দেন। তখন মাটি দুভাগ হয়ে যায় এবং সিংহাসনে চড়ে ভূমিদেবী আবির্ভূত হয়ে সীতাকে নিয়ে পাতালপুরীতে বিলীন হয়ে যায়।

Comments

Popular posts from this blog

রাজা রামমোহন রায়,,

স্যার আইজ্যাক নিউটন,,,

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর,,,,