রবীন্দ্রনাথ
বাংলা সাহিত্যের নোবেলজয়ী মহাকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সংক্ষিপ্ত জীবনী নিচে তুলে ধরা হলো:
জন্ম ও পরিবার
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৬১ সালের ৭ মে (১২৬৮ বঙ্গাব্দের ২৫শে বৈশাখ) কলকাতার জোড়াসাঁকোর বিখ্যাত ঠাকুর পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং মাতা সারদাসুন্দরী দেবী। তিনি ছিলেন মা-বাবার চতুর্দশ সন্তান।
বাল্যকাল ও শিক্ষাজীবন
শৈশবে প্রথাগত বিদ্যালয় জীবনের প্রতি তাঁর চরম অনীহা ছিল। ওরিয়েন্টাল সেমিনারি, নরম্যাল স্কুল বা বেঙ্গল একাডেমির মতো বিদ্যালয়ে তিনি বেশিদিন টিকতে পারেননি। তাই বাড়িতেই গৃহশিক্ষকদের কাছে তাঁর শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়।
১৮৭৮ সালে আইন পড়ার উদ্দেশ্যে তিনি ইংল্যান্ডে যান, কিন্তু সেখানেও প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি নেওয়া শেষ না করেই ১৮৮০ সালে দেশে ফিরে আসেন। প্রকৃতি এবং চারপাশের জীবনই ছিল তাঁর আসল শিক্ষক।
বৈবাহিক জীবন ও জমিদারি পরিচালনা
১৮৮৩ সালের ৯ ডিসেম্বর মৃণালিনী দেবীর সাথে রবীন্দ্রনাথের বিয়ে হয়। ১৮৯০ সাল থেকে তিনি পিতার আদেশে পূর্ববঙ্গের (বর্তমান বাংলাদেশের) শিলাইদহ, শাহজাদপুর ও পতিসরে জমিদারি দেখাশোনার দায়িত্ব নেন। বাংলাদেশের নদী, প্রকৃতি এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা তাঁর সাহিত্য সৃষ্টিতে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। এই সময়েই তিনি তাঁর বিখ্যাত অনেক ছোটগল্প ও কবিতা রচনা করেন।❤️
শান্তিনিকেতন ও বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠা
১৯০১ সালে তিনি পশ্চিমবঙ্গের বোলপুরের কাছে শান্তিনিকেতন আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরবর্তীতে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এখানে তিনি প্রাচীন ভারতের তপোবনের আদলে প্রকৃতির মাঝে উন্মুক্ত শিক্ষার ব্যবস্থা করেন।🌺
নোবেল পুরস্কার লাভ (১৯১৩)
১৯১০ সালে তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ 'গীতাঞ্জলি' প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে এর ইংরেজি অনুবাদ Song Offerings প্রকাশিত হলে তা পশ্চিমা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করে।
১৯১৩ সালে তিনি প্রথম অ-ইউরোপীয় এবং প্রথম এশীয় হিসেবে সাহিত্যে সম্মানজনক নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।
১৯১৫ সালে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে 'নাইটহুড' (স্যার) উপাধিতে ভূষিত করে। তবে ১৯১৯ সালে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর দ্বারা নির্মম 'জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের' প্রতিবাদে তিনি ঘৃণায় সেই উপাধি বর্জন করেন।🌺
সাহিত্যকর্ম ও অবদান
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, গল্পকার, প্রাবন্ধিক, নাট্যকার, সংগীত রচয়িতা এবং চিত্রশিল্পী।
উপন্যাস: গোরা, ঘরে বাইরে, চোখের বালি, শেষের কবিতা।
ছোটগল্প: তিনি বাংলা ছোটগল্পের জনক। তাঁর বিখ্যাত গল্পের মধ্যে রয়েছে পোস্টমাস্টার, কাবুলিওয়ালা, ছুটি, হৈমন্তী ইত্যাদি।
সংগীত: তিনি প্রায় ২,২৩০টি গান রচনা করেছেন, যা রবীন্দ্রসংগীত নামে পরিচিত।🌷
জাতীয় সংগীত: বিশ্বের একমাত্র কবি হিসেবে তাঁর রচিত গান দুটি ভিন্ন দেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে গৃহীত হয়েছে—বাংলাদেশের 'আমার সোনার বাংলা' এবং ভারতের 'জনগণমন-অধিনায়ক জয় হে'। (শ্রীলঙ্কার জাতীয় সংগীতেও তাঁর ভাবধারার গভীর প্রভাব রয়েছে)।
মহাপ্রয়াণ
জীবনের শেষভাগে তিনি চিত্রাঙ্কনে মনোনিবেশ করেন এবং তাঁর আঁকা ছবিগুলো আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়। ১৯৪১ সালের ৭ আগস্ট (১৩৪৮ বঙ্গাব্দের ২২শে শ্রাবণ) কলকাতার জোড়াসাঁকোর বাসভবনে এই মহান মনীষী শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর অমর সৃষ্টির মাধ্যমে বাঙালি সংস্কৃতির মূল ভিত্তি হয়ে আছেন এবং চিরকাল থাকবেন।
Comments
Post a Comment