সমাস

 বাংলা ব্যাকরণে 'সমাস' একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মজাদার অধ্যায়। সমাস শব্দের অর্থ হলো সংক্ষেপণ, মিলন বা একাধিক পদের একপদীকরণ। সহজ কথায়, পরস্পর অর্থসঙ্গতি আছে এমন দুই বা ততোধিক পদ মিলে যখন একটি নতুন পদে পরিণত হয়, তখন তাকে সমাস বলে। যেমন: 'সিংহ চিহ্নিত আসন' না বলে আমরা বলি 'সিংহাসন'। নিচে সমাস সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো: সমাস সম্পর্কিত কিছু জরুরি পরিভাষা সমাস ভালোভাবে বুঝতে গেলে নিচের ৪টি শব্দ জানা জরুরি: সমস্যমান পদ: যে যে পদ মিলে সমাস হয়, তাদের প্রত্যেকটিকে সমস্যমান পদ বলে। (যেমন: 'সিংহ' এবং 'আসন')। সমস্তপদ বা সমাসবদ্ধ পদ: সমাস হওয়ার পর যে নতুন একটি পদ তৈরি হয়, তাকে সমস্তপদ বলে। (যেমন: 'সিংহাসন')। পূর্বপদ ও উত্তরপদ (পরপদ): সমস্তপদের প্রথম অংশকে বলা হয় পূর্বপদ এবং পরের অংশকে বলা হয় উত্তরপদ বা পরপদ। (যেমন: 'সিংহ' হলো পূর্বপদ, 'আসন' হলো পরপদ)। ব্যাসবাক্য (বিগ্রহবাক্য): সমস্তপদকে ভেঙে যে বাক্যাংশ তৈরি করা হয়, তাকে ব্যাসবাক্য বলে। (যেমন: 'সিংহ চিহ্নিত আসন')। সমাসের প্রকারভেদ প্রধানত সমাস ছয় প্রকার। নিচে এদের সহজ ব্যাখ্যা ও উদাহরণ দেওয়া হলো: ১. দ্বন্দ্ব সমাস যে সমাসে পূর্বপদ ও পরপদ—উভয় পদের অর্থের প্রাধান্য থাকে এবং ব্যাসবাক্যে 'ও', 'এবং', 'আর' ব্যবহৃত হয়, তাকে দ্বন্দ্ব সমাস বলে। উদাহরণ: মা ও বাবা = মা-বাবা, আয় ও ব্যয় = আয়-ব্যয়, ভালো ও মন্দ = ভালো-মন্দ। ২. কর্মধারয় সমাস যেখানে বিশেষণ বা বিশেষণভাবাপন্ন পদের সাথে বিশেষ্য বা বিশেষ্যভাবাপন্ন পদের সমাস হয় এবং পরপদের অর্থ প্রধান রূপে প্রতীয়মান হয়, তাকে কর্মধারয় সমাস বলে।



 এটি চার প্রকার: মধ্যপদলোপী কর্মধারয়: ব্যাসবাক্যের মাঝখানের পদ লোপ পায়। (যেমন: সিংহ চিহ্নিত আসন = সিংহাসন)। উপমান কর্মধারয়: সাধারণ গুণের উল্লেখ থাকে এবং প্রত্যক্ষ তুলনা হয়। (যেমন: ভ্রমরের ন্যায় কৃষ্ণ কেশ = ভ্রমরকৃষ্ণকেশ)। উপমিত কর্মধারয়: সাধারণ গুণের উল্লেখ থাকে না, কাল্পনিক তুলনা হয়। (যেমন: মুখ চন্দ্রের ন্যায় = মুখচন্দ্র)। রূপক কর্মধারয়: উপমান ও উপমেয়ের মধ্যে অভেদ কল্পনা করা হয়। ব্যাসবাক্যে 'রূপ' থাকে। (যেমন: মন রূপ মাঝি = মনমাঝি, ক্রোধ রূপ অনল = ক্রোধানল)। ৩. তৎপুরুষ সমাস পূর্বপদে দ্বিতীয় থেকে সপ্তমী পর্যন্ত বিভক্তির (কে, রে, দ্বারা, জন্য, হতে, এর, তে ইত্যাদি) লোপ হয়ে যে সমাস হয় এবং পরপদের অর্থ প্রধান হয়, তাকে তৎপুরুষ সমাস বলে। উদাহরণ: দুঃখকে প্রাপ্ত = দুঃখপ্রাপ্ত (দ্বিতীয়া তৎপুরুষ) মন দিয়ে গড়া = মনগড়া (তৃতীয়া তৎপুরুষ) গুরুকে ভক্তি = গুরুভক্তি (চতুর্থী তৎপুরুষ) বিলাত থেকে ফেরত = বিলাতফেরত (পঞ্চমী তৎপুরুষ) রাজার পুত্র = রাজপুত্র (ষষ্ঠী তৎপুরুষ) গাছে পাকা = গাছপাকা (সপ্তমী তৎপুরুষ) ৪. বহুব্রীহি সমাস যে সমাসে পূর্বপদ বা পরপদ—কোনোটির অর্থ না বুঝিয়ে অন্য কোনো তৃতীয় পদ বা নতুন অর্থ বোঝায়, তাকে বহুব্রীহি সমাস বলে। ব্যাসবাক্যের শেষে সাধারণত 'যার' বা 'যাতে' থাকে। উদাহরণ: মহান আত্মা যার = মহাত্মা (এখানে মহান বা আত্মা প্রধান নয়, একজন ব্যক্তিকে বোঝাচ্ছে)। দশ আনন (মুখ) যার = দশানন (রাবণ)। ৫. দ্বিগু সমাস পূর্বপদে সংখ্যাবাচক শব্দ থাকে এবং পরপদটি বিশেষ্য হয়, আর সমস্তপদটি দিয়ে সমাহার বা মিলন বোঝায়, তাকে দ্বিগু সমাস বলে। এতেও পরপদের অর্থ প্রধান থাকে। উদাহরণ: তিন কালের সমাহার = ত্রিকাল, চার রাস্তার সমাহার = চৌরাস্তা, শত অব্দের (বছরের) সমাহার = শতাব্দী। ৬. অব্যয়ীভাব সমাস পূর্বপদে অব্যয় পদ থাকে এবং সেই অব্যয়ের অর্থের প্রাধান্য দিয়ে যে সমাস হয়, তাকে অব্যয়ীভাব সমাস বলে। এটি সাধারণত সামীপা (কাছাকাছি), বিপ্সা (পৌনঃপুনিকতা), অভাব, পর্যন্ত ইত্যাদি অর্থে ব্যবহৃত হয়। উদাহরণ: কূলের সমীপে = উপকূল (সামীপ্য অর্থে) ভাতের অভাব = হাভাত (অভাব অর্থে) মরণ পর্যন্ত = আমরণ (পর্যন্ত অর্থে) দিন দিন = প্রতিদিন (বিপ্সা বা অনুকরণ অর্থে) এক নজরে মনে রাখার সহজ উপায় (অর্থের প্রাধান্য): দ্বন্দ্ব সমাস: উভয় পদের অর্থ প্রধান। (মা-বাবা) বহুব্রীহি সমাস: কোনো পদের অর্থ প্রধান নয়, নতুন অর্থ বোঝায়। (দশমুখী) অব্যয়ীভাব সমাস: পূর্বপদের অর্থ প্রধান। (উপকূল) তৎপুরুষ, কর্মধারয় ও দ্বিগু সমাস: পরপদের অর্থ প্রধান। (রাজপুত্র, সিংহাসন, চৌরাস্তা) এছাড়াও প্রাদি, নিত্য, অলুক সমাস নামে কিছু অপ্রধান সমাসও ব্যাকরণে দেখা যায়। সমাস মূলত বড় বাক্যকে ছোট করে ভাষাকে শ্রুতিমধুর ও সহজ করতে সাহায্য করে। সমাসের কোনো নির্দিষ্ট প্রকারভেদ বা উদাহরণ নিয়ে আপনার মনে কোনো বিভ্রান্তি বা করা

Comments

Popular posts from this blog

রাজা রামমোহন রায়,,

স্যার আইজ্যাক নিউটন,,,

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর,,,,