মেসির জীবনী,,,

আর্জেন্টাইন ফুটবল জাদুকর লিওনেল মেসি (Lionel Messi)-এর জীবন এক রূপকথার চেয়ে কম নয়। এক সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নিয়ে, শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে ফুটবলের ইতিহাসের সর্বকালের সেরা (GOAT - Greatest of All Time) হয়ে ওঠার গল্প এটি।


নিচে মেসির জীবনের একটি বিস্তারিত ও বড় বর্ণনা দেওয়া হলো:


১. জন্ম ও শৈশব (১৯৮৭ - ২০০০)

লিওনেল মেসি ১৯৮৭ সালের ২৪ জুন আর্জেন্টিনার রোজারিও শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তার পুরো নাম লিওনেল আন্দ্রেস মেসি কুচ্চিত্তিনি। তার বাবা হোর্হে মেসি ছিলেন একটি ইস্পাত কারখানার শ্রমিক এবং মা সেলিয়া কুচ্চিত্তিনি খণ্ডকালীন পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন।


ফুটবলের হাতেখড়ি: মাত্র চার বছর বয়সে স্থানীয় ক্লাব ‘গ্রান্দোলি’-তে মেসির ফুটবলের যাত্রা শুরু হয়, যেখানে তার প্রথম কোচ ছিলেন তার বাবা। তবে ফুটবলে তাকে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিলেন তার নানি সেলিয়া। (আজও গোল করার পর মেসি যে দুই হাত তুলে আকাশের দিকে তাকান, তা মূলত তার প্রয়াত নানিকে উৎসর্গ করে)।


নিউলস ওল্ড বয়েজ: ৬ বছর বয়সে তিনি রোজারিওর বিখ্যাত ক্লাব ‘নিউলস ওল্ড বয়েজ’-এ যোগ দেন। সেখানে ৬ বছরে তিনি প্রায় ৫০০ গোল করেন।

শারীরিক প্রতিবন্ধকতা: ১১ বছর বয়সে মেসির শরীরে গ্রোথ হরমোন ডেফিসিয়েন্সি (Growth Hormone Deficiency) বা হরমোনজনিত সমস্যা ধরা পড়ে, যার কারণে তার শারীরিক বৃদ্ধি থমকে যায়। এই চিকিৎসার জন্য প্রতি মাসে প্রায় ৯০০ ডলার প্রয়োজন ছিল, যা তার পরিবারের পক্ষে বহন করা অসম্ভব ছিল। আর্জেন্টিনার বিখ্যাত ক্লাব রিভার প্লেট তাকে দলে নিতে চাইলেও এই চিকিৎসার খরচ দিতে অস্বীকৃতি জানায়।


২. বার্সেলোনা অধ্যায় ও ‘টিস্যু পেপার’ চুক্তি (২০০০ - ২০২১)

মেসির প্রতিভা দেখে বার্সেলোনার তৎকালীন স্পোর্টিং ডিরেক্টর কার্লেস রেক্সাচ তাকে স্পেনে নিয়ে আসেন। মেসির খেলা দেখে তিনি এতটাই মুগ্ধ হন যে, হাতের কাছে কোনো কাগজ না পেয়ে একটি টিস্যু পেপারে মেসির সাথে বার্সেলোনার প্রথম চুক্তি স্বাক্ষর করেন। বার্সেলোনা মেসির চিকিৎসার সমস্ত খরচ বহন করার দায়িত্ব নেয়।


লা মাসিয়া ও মূল দলে অভিষেক: বার্সেলোনার বিখ্যাত যুব একাডেমি ‘লা মাসিয়া’ (La Masia)-তে মেসির দ্রুত উন্নতি ঘটে। ২০০৪ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে বার্সেলোনার মূল দলের হয়ে লিগ ম্যাচে তার অভিষেক হয়।


স্বর্ণযুগ (২০০৮ - ২০১২): পেপ গার্দিওলা বার্সেলোনার কোচ হয়ে আসার পর মেসির ক্যারিয়ারে বিপ্লব ঘটে। ২০০৯ সালে বার্সেলোনা ঐতিহাসিক ‘সেক্সটুপল’ (এক বছরে ৬টি ট্রফি) জয় করে এবং মেসি তার প্রথম ব্যালন ডি'অর জেতেন। ২০১২ সালে মেসি এক ক্যালেন্ডার ইয়ারে রেকর্ড ৯১টি গোল করে পেলের রেকর্ড ভেঙে দেন।


এমএসএন (MSN) ত্রয়ী: পরবর্তীতে লুইস সুয়ারেজ এবং নেইমারের সাথে জুটি বেঁধে মেসি বার্সেলোনাকে ফুটবলের চূড়ায় নিয়ে যান। বার্সেলোনার হয়ে মেসি রেকর্ড ৩৫টি ট্রফি জেতেন, যার মধ্যে ৪টি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ এবং ১০টি লা লিগা শিরোপা রয়েছে। তিনি ক্লাবের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা (৬৭২ গোল) হিসেবে বিদায় নেন।


৩. আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার ও আর্জেন্টিনার হয়ে সংগ্রাম

মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার যেমন গৌরবের, তেমনি ছিল প্রচণ্ড মানসিক যন্ত্রণার।


প্রাথমিক সাফল্য ও ব্যর্থতার যন্ত্রণা: ২০০৫ সালে অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ এবং ২০০৮ সালে বেইজিং অলিম্পিকে স্বর্ণপদক জিতলেও, মূল জাতীয় দলের হয়ে ট্রফি জেতা মেসির জন্য এক দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছিল।


টানা তিন ফাইনাল হার ও অবসর: ২০১৪ সালের বিশ্বকাপ ফাইনাল (জার্মানির কাছে ১-০ গোলে হার), ২০১৫ এবং ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকা ফাইনালে চিলির কাছে টাইব্রেকারে হেরে যায় আর্জেন্টিনা। ২০১৬ সালের কোপা হারের পর প্রচণ্ড হতাশায় মেসি আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন। তবে বিশ্বজুড়ে ভক্তদের আকুল আবেদন এবং ভালোবাসার টানে তিনি আবারও ফিরে আসেন।


৪. মহাকাব্যিক প্রত্যাবর্তন ও অধরা স্বপ্ন পূরণ (২০২১ - ২০২২)

২০২১ সাল থেকে মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে এক অবিশ্বাস্য মোড় আসে।


কোপো আমেরিকা জয় (২০২১): ব্রাজিলের মারাকানা স্টেডিয়ামে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিলকে হারিয়ে মেসি আর্জেন্টিনার হয়ে তার প্রথম বড় আন্তর্জাতিক ট্রফি ‘কোপা আমেরিকা’ জেতেন।


ফিনালিসিমা (২০২২): ইউরোপ চ্যাম্পিয়ন ইতালিকে হারিয়ে আর্জেন্টিনা ফিনালিসিমা ট্রফি জেতে।


কাতার বিশ্বকাপ জয় (২০২২): ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ ছিল মেসির জীবনের সবচেয়ে বড় মহাকাব্য। পুরো টুর্নামেন্টে ৭টি গোল ও ৩টি অ্যাসিস্ট করে তিনি আর্জেন্টিনাকে ৩৬ বছর পর বিশ্বকাপ এনে দেন। ফাইনালে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে রোমাঞ্চকর লড়াইয়ের পর টাইব্রেকারে জয় পায় আর্জেন্টিনা। মেসি টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে ‘গোল্ডেন বল’ জেতেন। এই জয়ের মাধ্যমে ফুটবলের ইতিহাসে তার শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে সমস্ত বিতর্কের অবসান ঘটে।


৫. বার্সেলোনা পরবর্তী জীবন: পিএসজি ও ইন্টার মায়ামি

পিএসজি (PSG) অধ্যায় (২০২১ - ২০২৩): ২০২১ সালে বার্সেলোনার আর্থিক সংকটের কারণে চোখের জলে ক্লাব ছাড়তে বাধ্য হন মেসি। তিনি ফরাসি ক্লাব প্যারিস সেন্ট জার্মেই (PSG)-তে যোগ দেন এবং সেখানে দুটি লিগ ওয়ান শিরোপা জেতেন।


ইন্টার মায়ামি (২০২৩ - বর্তমান): ২০২৩ সালে ইউরোপিয়ান ফুটবলের পাঠ চুকিয়ে মেসি যুক্তরাষ্ট্রের মেজর লিগ সকার (MLS)-এর ক্লাব ইন্টার মায়ামিতে যোগ দেন। সেখানে যোগ দিয়েই তিনি ক্লাবটিকে তাদের ইতিহাসের প্রথম ট্রফি (লিগস কাপ) এনে দেন।


৬. অর্জন ও রেকর্ডসমূহ

মেসির ক্যারিয়ারের রেকর্ডগুলো এতই বিশাল যে তা সংক্ষেপে প্রকাশ করা কঠিন। তার প্রধান কিছু অর্জন:


ব্যালন ডি'অর (Ballon d'Or): ফুটবলের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৮ বার এই পুরস্কার জিতেছেন (২০০৯, ২০১০, ২০১১, ২০১২, ২০১৫, ২০১৯, ২০২১, ২০২৩)।


ইউরোপীয় গোল্ডেন শু: সর্বোচ্চ ৬ বার।


সর্বমোট ট্রফি: ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি ট্রফি (৪৫টি) জয়ী খেলোয়াড় তিনি।


ব্যক্তিগত জীবন ও ব্যক্তিত্ব

২০০৮ সাল থেকে মেসি তার শৈশবের প্রেমিকা আন্তোনেলা রোকুজ্জো-এর সাথে সংসার করছেন, ২০১৭ সালে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ে করেন। তাদের তিন ছেলে রয়েছে—থিয়াগো, মাতেও এবং চিরো।


মাঠের বাইরে মেসি তার শান্ত স্বভাব এবং দানশীলতার জন্য পরিচিত। তিনি ‘লিও মেসি ফাউন্ডেশন’ এর মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা ও চিকিৎসার জন্য কাজ করেন এবং ইউনিসেফ (UNICEF)-এর গুডউইল অ্যাম্বাসেডর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।

Comments

Popular posts from this blog

রাজা রামমোহন রায়,,

স্যার আইজ্যাক নিউটন,,,

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর,,,,